1. admin@example.com : admin :
বিশ্বাসের সেতু: মন বোঝার এক অনন্য গল্প - দৈনিক সংগ্রামী কন্ঠ
October 25, 2026, 8:37 am

বিশ্বাসের সেতু: মন বোঝার এক অনন্য গল্প

Reporter Name
  • Update Time : Friday, October 2, 2026
  • 53 Time View

বিশ্বাসের সেতু: মন বোঝার এক অনন্য গল্প

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শহরের একপ্রান্তের ছোট্ট পার্কটি ফাঁকা হয়ে আসে। রোদচশমা পরা প্রবীণ আনিস সাহেব প্রায়ই এই সময়ে পার্কের বেঞ্চে এসে বসেন। তার ঠিক পাশেই বসেছিলেন তরুণ নাঈম আর তার স্ত্রী রিয়া। নাঈমের মুখ গম্ভীর, চোখের চাউনিতে চাপা ক্ষোভ।

হঠাৎ করেই রিয়া একটু উঁচু গলায় বলে উঠল, “তুমি ইচ্ছে করেই সেদিন আমার ফোনটা ধরোনি, না? সবার সামনে আমাকে অপমান করাই এখন তোমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে!”

নাঈম দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল, “সবকিছুতেই তোমার মাথায় কুচিন্তা আসে! আমি সারাদিন অফিস সামলে মরে যাই, আর তুমি বোঝো শুধু নিজেরটা।”

তাদের এই কথা কাটাকাটি যখন চরমে, তখন পাশে বসা আনিস সাহেব মৃদু হেসে একটি ছোট খাতা তাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “বাবা, একটু কি এই পৃষ্ঠাটা পড়তে পারবে?”

নাঈম কিছুটা বিরক্ত হয়েই খাতাটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল। সেখানে লেখা ছিল এক মর্মান্তিক ও শিক্ষণীয় ঘটনা—

“আজ অফিসে খুব বিপদে পড়েছিলাম। মেজাজ এত খারাপ ছিল যে কারো সাথে একটা কথাও বলতে ইচ্ছে করছিল না। ভাবলাম রিয়াকে ফোন করে একটু শান্তি পাবো। ও ফোন তুলতেই বললাম, ‘তোমার সাথে এখন কথা বলার কোনো সময় নেই!’—বলেই ফোন কেটে দিলাম।”

নাঈম লেখাটি শেষ করে অবাক হয়ে আনিস সাহেবের দিকে তাকাল। আনিস সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই ডায়েরিটি আমারই লেখা। গত পঁচিশ বছর ধরে এটি আমার অহংকার আর ভুল বোঝাবুঝির দলিল হয়ে আছে।”

নাঈম কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন চাচা? কী হয়েছিল?”

আনিস সাহেব বলতে শুরু করলেন, “আজ থেকে পঁচিশ বছর আগের কথা। সেদিন আমার স্ত্রী মীনা আমাকে অফিস থেকে ফিরতি পথে একটা বিশেষ ওষুধ এনে দিতে বলেছিল। আমি কাজের চাপে ভুলেই গিয়েছিলাম। বাসায় ফেরার পর মীনা যখন জিগ্যেস করল, তখন লজ্জায় ও রাগে আমি চেঁচিয়ে বলেছিলাম, ‘আমার আর কোনো কাজ নেই! সারাদিন শুধু তোমার ফরমায়েশ খাটবো?'”

“মীনা সেদিন একটা কথাও বলেনি। চুপ করে রান্নাঘরে চলে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, ও বোধহয় আমার ওপর রাগ করেছে, কিংবা আমার ওপর তার কোনো ভালোবাসাই নেই। পরদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখি, মীনা বিছানায় নেই। ড্রয়িং টেবিলের ওপর একটি চিরকুট পড়ে আছে…”

আনিস সাহেবের গলা কিছুটা কাঁপতে লাগল। তিনি থামলেন, তারপর বললেন—

“চিরকুটে লেখা ছিল—’আনিস, তোমার আজকের রাগ দেখে বুঝলাম, আমার থাকা না থাকায় তোমার জীবনে কোনো পার্থক্য তৈরি হয় না। যে ওষুধটি আনতে ভুলে গিয়েছিলে, কাল রাতে বুকে তীব্র ব্যথার কারণে সেটাই খুঁজে পাইনি। ভালো থেকো।'”

পার্কের বেঞ্চে তখন পিনপতন নীরবতা। রিয়া আর নাঈম দুজনেই স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।

আনিস সাহেব রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই দিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি আর কোনো দিন মীনার মুখ দেখতে পাইনি। সে চলে গেছে বহু দূরে। শুধু রেখে গেছে এই অনুতাপ— মানুষের মন বুঝতে যেখানে বছরের পর বছর সাধনা করতে হয়, সেখানে ভুল বুঝতে মাত্র এক মুহূর্তই যথেষ্ট।”

নাঈমের হাত থেকে খাতাটি ফসকে নিচে পড়ে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটু আগে ঘটে যাওয়া নিজের দৃশ্যটি। সে তো সত্যিই জানত না যে, রিয়া সেদিন তার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য নিজের হাতে তার পছন্দের খাবার রান্না করে অপেক্ষা করছিল, আর নাঈম শুধু একটা ছোট ভুল বোঝাবুঝিতে সব মাটি করে দিচ্ছিল।

নাঈম আস্তে করে রিয়ার হাত দুটো নিজের মুঠোয় তুলে নিল। চোখে জল চিকচিক করছে। রিয়াও আর রাগ ধরে রাখতে পারল না, নীরবে স্বামীর কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল।

গল্পের শিক্ষা

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—আমরা মানুষের ‘আচরণ’ দেখি, কিন্তু তার ‘অবস্থা’ দেখতে চাই না। কাউকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তার জায়গা থেকে একবার পরিস্থিতিটা ভাবুন। সামান্য একটু ধৈর্য, একটি প্রশ্ন আর একটুখানি সহানুভূতি বহু সম্পর্ককে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category